
বাংলাদেশের মুখ ডেস্ক:
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহবায়ক এএসএম ড. নুরুল হক ভূইয়ার অবদানের আজো স্বীকৃতি পাননি। তিনি রাষ্ট্রভাষার জন্য সংগ্রাম করলেও তার অবদানের কথা কেউ মনে রাখেনি। তার অবদানের জন্য সড়কের নাম করণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এছাড়াও তাকে রাষ্টীয় পদকে ভূষিত করার দাবি তোলেন। ড. নুরুল হক ভূইয়ার গ্রামের বাড়ি সোনারগাঁয়ের নোয়াগাঁও ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে। ড. নূরুল হক ভূঁইয়া ১৯২৩ সালের ১মে জন্ম গ্রহণ করেন। ড. নুরুল হক ভূইয়ার পুরো নাম আবু সাঈদ মোহাম্মদ নুরুল হক ভূইয়া। তার ডাক নাম ছিল মনির হোসেন। তার বাবার নাম মৌলবী সাহাবুদ্দিন ভূইয়া।
ড. নুরুল হক ভূইয়া ১৯৩৯ সালে মহজমপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ডিষ্টিংশনসহ প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করেন। পরে ১৯৪১ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি পাস করার পর ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে বিএসসি(সম্মান) এবং ১৯৪৫ সালে কৃতিত্বের সাথে এমএসসি পাশ করেন। নূরুল হক ভূঁইয়া পরের বছরই ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এ থেকেই ড. নূরুল হক ভূঁইয়ার কর্মময় ও ঘটনা বহুল জীবন শুরু হয়। ১৯৭২ সালে ফলিত রসায়ন বিভাগ নামে নতুন বিভাগ সৃষ্টির পর এ বিভাগে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। একই বছর তিনি স্যার এএফ রহমান হলের প্রথম প্রভোস্টের দায়িত্ব লাভ করেন। ফলিত রসায়ন বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীর সূত্রপাত ঘটিয়ে সফলতার সাথে ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যানের পদ থেকে অবসর নেন। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত একই বিভাগে তার অবদান ও জনপ্রিয়তার কারনে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৮ সালে কমনওয়েথ স্কলারশিপ ও ১৯৬০ সালে যথাক্রমে কলম্বো প্ল্যান ও পাকিস্তান অ্যাটমিক অ্যানার্জি কমিশনের ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত হয়েও সম্পূর্ণ দেশাত্মবোধের প্রতি অনমনীয় মনোভাবের কারণে বিদেশী ডিগ্রির প্রতি অনিহা প্রকাশ করে তা প্রত্যাখান করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।
জানা যায়, ১৯৪৭ সালে ১ সেপ্টেম্বর ‘তমদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয়। তমদ্দুন মজলিসের প্রথম শ্রেণীর নেতা ছিলেন ড. নুুরুল হক ভূইয়া। ১৫ সেপ্টেম্বর এ মজলিসের নেতারা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গ্রহন করে। এ সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহবায়ক ছিলেন ড. নূরুল হক ভূঁইয়া।
ড. নুরুল হক ভূইয়া পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবীতে ৫২’র ভাষা আন্দোলনে যেমন সক্রিয় ছিলেন তেমনি ৬৬ ছয় দফা আন্দোলন ও ৭১ মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা সংক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে পাটের অগ্নিরোধক মিশ্রন উৎপাদন প্রণালীর তত্ত্ব আবিষ্কার করে প্রশংসিত হয়েছেন। এছাড়াও তিনি দ্রুত বেগ সম্পন্ন বিমান ইঞ্জিন এবং ইঞ্জিনের উদ্বায়ী জ্বালানী দীর্ঘ স্থায়ীত্বের সহায়ক ‘মলিবডেনাম ডাই- সালফাইড’ নামের সলিড লুব্রিকেন্ট আবিষ্কার করে আন্তজার্তিক স্বীকৃতি লাভ করেছেন। ১৯৯৮ সালের ২ এপ্রিল ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
স্থানীয়রা দাবি ড. নূরুল হক ছিলেন মানব দরদী মানুষ। তিনি ঢাকা থেকে যখন গ্রামে আসতেন তখন গ্রামের মানুষকে নানা ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তিনি বাংলা ভাষার জন্য বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন। তার অবদানের স্বীকৃতি আজো পাননি। তাকে মরনোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করার জন্য সরকারের কাছে বিনীতভাবে আবেদন জানাচ্ছি।
ভাষা সৈনিক নূরুল হকের নাতি বায়জিদ হোসেন ভূঁইয়া জানান, আমার দাদা ছিলেন একজন দেশ প্রেমিক মানুষ। দাদার অবদানের কথা নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না। তাই সোনারগাঁ উপজেলার তলতলা থেকে বারদী সড়কটি দাদার নামে ভাষা সৈনিক ড. নূরুল হক সড়ক নামকরনের জোড় দাবি জানাচ্ছি।
গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা কবি জামান ভূইয়া বলেন, ড. নূরুল হক ভূঁইয়ার মত কালোত্তীর্ন একজন পন্ডিত, শিক্ষাবিধ, ভাষা সৈনিক, প্রতিথযশা বিজ্ঞানী সমাজ হিতৈষীর মৃত্যুতে জাতির যে অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে। তার অবদান জাতি ভুলতে পারবে না। তার অবদানের জন্য তার নামে একটি সড়কের নাম করণ ও তার সমাধি সংরক্ষন ও পাঠাগার নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, নূরুল হক ভুইয়া রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন এটি আমার জানা ছিল না। এ ভাষা সৈনিকের নামে সড়কের নামকরন করা ও কবর সংরক্ষনসহ প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ গ্রহন করবো।